স্বাস্থ্য

প্রাকৃতিক ঔষুধে গ্যাস্ট্রিক দূর করার উপায়

আজ আমরা জানবো প্রাকৃতিক ঔষুধ ব্যবহার করে গ্যাস্ট্রিক দূর করার উপায়। কমবেশি বাংলাদেশি সবার একটা কমন রোগ হলো গ্যাস্ট্রিক। কারো বাসায় অন্য কোনো রোগের মেডিসিন থাকুক বা না থাকুক গ্যাস্টিকের একটা ব্লিস্টার বা ঔষধের পাতা থাকাটা আবশ্যিক। আমরা এই গ্যাস্ট্রিককে আরো অনেকগুলো নামে চিনি। যেমন আলসার,এসিডিটি,হার্টবার্ণ ইত্যাদি। চিকিৎসার ভাষায় নামটা আরো জটিল। চিকিৎসার ভাষায় এর ফুল ফর্ম হলো Gastroesophageal Reflux Disease (GERD)

গ্যাস্ট্রিকের লক্ষণ

  • বুক এবং গলায় জ্বালাপোড়া ভাব।
  • মুখে টক টক ভাব
  • বমি ভাব
  • বদ হজম
  • পেট ফাপা
  • বেশি বেশি কাশি বা হেচকি হওয়া
  • বেশি বেশি ঢেকুর আসা
  • কন্ঠ খারাপ হয়ে যাওয়া
  • এবং শ্বাসে দূঃগন্ধ আসা এগুলোই গ্যাস্ট্রিক এর বহুল পরিচিত কিছু লক্ষণ।

আমরা যখন খাবার খাই,তখন খাবার পাকস্থলীতে যেয়ে পাকস্থলীতে বিদ্যমান এসিড এর সাথে বিক্রিয়া করে হজমের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। সেই খাবার আর এসিড গুলো নিচের দিকে যেতে থাকে পায়ুপথের দিকে। কোনো কারণে যদি পাকস্থলীর এসিড নিচের দিকে না যেয়ে উপরে উঠতে শুরু করে তখন বুকে জ্বালা পোড়া হয় এবং বাকি নানা লক্ষণ ও পাশাপাশি দেখা যায়। বয়স এবং শারীরিক গড়ন ভেদে এর কারণ বিভিন্ন হয়ে থাকে।

কি কি কারণে গ্যাস্ট্রিক হতে পারে

ধূমপান করলে, অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার খেলে, অধিক মাত্রায় টেনশন করলে, ওজন স্বাভাবিক এর চেয়ে বেশি হলে, একই সাথে প্রয়োজনের তুলনায় অধিক খাবার খেলে এই সমস্যা হয়ে থাকে। এছাড়া গর্ভবতী মহিলাদের ও এই সমস্যা হতে পারে। কিছু কিছু ঔষধ যেমন এসপিরিন, আইবোপ্রোফেন সেবনের ফলেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। তখন অবশ্যই ডাক্তার এর সাথে পরামর্শ করতে হবে।

গ্যাস্ট্রিক দূর করার উপায়

গ্যাস্ট্রিক থেকে মুক্তির উপায়
গ্যাস্ট্রিক থেকে মুক্তির উপায়

গ্যাস্ট্রিক এর সমস্যা নিরসনে মূলত আমরা ডাক্তার এর পরামর্শ গ্রহণ করে থাকি। এর পাশাপাশি প্রাত্যহিক জীবনে কি কি পরিবর্তন আনতে পারি যার ফলে আমরা এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাবো সে সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

১.সকালে খালি পেটে কুসুম গরম পানি খাওয়া

প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি অ্যাকুপ্রেশার অনুযায়ী,
সকালে উঠে খালি পেটে কুসুম গরম পানি খাওয়ার অভ্যাস করুন। ১-২ গ্লাস পানি পান দিয়ে শুরু করুন। পানি খাওয়ার আধা ঘন্টা পর সকালের নাস্তা করুন। এতে পেটের গ্যাস এর সমস্যা অনেকটাই দূর হবে।

আমি নিজেও গত কয়েক বছর ধরে এভাবেই গরম পানি খেয়ে আসছি। গ্যাস্ট্রিক এর সমস্যার শুরু থেকেই যদি এই পদ্ধতিতে নিয়মিত গরম পানি খাওয়া শুরু করেন তাহলে আপনার পেট পরিষ্কার হবে, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং গ্যাস এর সমস্যা থেকেও মুক্তি পাবেন।

২.পুরো দিনে অল্প অল্প করে খাবার খাওয়া

এক সাথে অনেক বেশি খাবার গ্রহণ করবেন না। পুরোদিনে অল্প অল্প করে খাবার গ্রহণ করবেন। একবারে অনেক বেশি খাবার খেলে আমাদের পাকস্থলী অনেক বেশি প্রসারিত হয়ে যায় তখন পাকস্থলীর ভিতরকার এসিড উপরে উঠে আসতে পারে যা থেকে বুকে জ্বালাপোড়া শুরু হয়।

৩.রাতের খাবার একটু জলদি সেরে ফেলতে হবে

অনেকের রাত করে খাবার খাওয়ার অভ্যাস আছে। রাতে খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লেই গ্যাস এর সমস্যা অনেকটা তিব্র হতে পারে।কারণ খাবার গ্রহণ শেষ করতেই পাকস্থলীতে হজম প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। আপনি যখন চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েন তখন পাকস্থলীর ভিতরকার এসিড উপরের দিকে উঠে আসতে পারে। যার ফলে বুকে জ্বালাপোড়া অস্বস্তিকর ভাব হতে থাকে। এইজন্য ঘুমানোর কমপক্ষে ২ থেকে ৩ ঘন্টা পূর্বে খাবার সেবন করতে হবে।

৪.সঠিক সময়ে খাবার গ্রহণ করতে হবে

খাবার সময় মোটেও অনিয়ম করা ঠিক নয়। খাবারের সময় অনিয়ম করলে আরেকটি রোগ হতে পারে যার নাম হল গ্যাসট্রাইটিস। এই রোগে পাকস্থলীতে ক্ষত দেখা দিতে পারে, ইনফেকশন হতে পারে। এই রোগ পেটে জ্বালাপোড়ার মতো হয়। তাই পাকস্থলীকে সুস্থ রাখতে সঠিক সময়ে খাবার গ্রহণ করতে হবে।

৫.সঠিক নিয়মে খাবার গ্রহণ করতে হবে

অনেকেই মনে করেন গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয়েছে সুতরাং কোন খাবার খাওয়া যাবে না এসব ধারণা একদম ই ভুল। বরং যেসব খাবার খেলে আপনার বুকে জ্বালাপোড়া হচ্ছে অথবা পেটে জ্বালাপোড়া হচ্ছে সেসব খাবার আপনার এড়িয়ে চলতে হবে এর পাশাপাশি সঠিক সময়ে খাবারের অভ্যাস করতে হবে।

৬.সঠিক নিয়মে বিছানায় শোবার চেষ্টা করুন

যাদের অনেক বেশি গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা রয়েছে বা বুকে জ্বালা পোড়া ভাব রয়েছে এই বিষয়টি তাদের জন্য বেশি প্রয়োজনীয়। যেমন যাদের অধিকতর বুকে জ্বালাপোড়া হয় তারা অবশ্যই ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা পূর্বে খাবার সেবন করবেন। এর পাশাপাশি শোয়ার সময় শরীরের উপরিভাগ অর্থাৎ বুক থেকে মাথা পর্যন্ত কিছুটা উঁচু অবস্থানে রাখার চেষ্টা করবেন। এবং শরীরের নিচের দিকটা খানিকটা নিচু অবস্থানে রাখার চেষ্টা করবেন। এই পদ্ধতিতে শোয়ার জন্য আপনার কোন অস্বস্তিকর অবস্থায় শোয়ার প্রয়োজন নেই বরং আপনি আপনার আরামদায়ক অবস্থান নিশ্চয়তা করেও এভাবে শোয়ার অভ্যাস করতে পারেন।

৭.অতিরিক্ত ওজন হলে তা কমানোর চেষ্টা করুন

অতিরিক্ত ওজন অন্যান্য অনেক রোগের পাশাপাশি গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাও সৃষ্টি করে থাকে। অতিরিক্ত ওজনের ফলে অনেক সময় পেটের ফ্যাট জমে থাকে। তখন কেউ যদি আরো বেশি পরিমাণে তৈলাক্ত খাবার গ্রহণ করে তাহলে পাকস্থলীতে সেই খাবার অনেকটাই গ্যাস হয়ে জমা হয়ে থাকে। যার ফলে পেট ফাপা অনুভূতি হয়।

৮.ধূমপান বন্ধ করুন

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যারা প্রচুর পরিমাণে ধূমপান করে, তাদের খুব অল্প বয়সেই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা দিতে থাকে। তাই অবশ্যই এই সমস্যা নিরসনের জন্য ধূমপানের মত বদঅভ্যাস ছাড়তে হবে।

৯.তৈলাক্ত খাবার বর্জন করতে হবে

বর্জন অনেক কঠিন একটা শব্দ হলেও আপনার শরীরের অবস্থা বিবেচনা করে, বাহিরের খোলা, ভোজ্য তেলে ভাজা খাবার যত কম গ্রহণ করতে পারেন ততই আপনার পাকস্থলী জনিত সমস্যা দূর হবে।

এগুলোর পাশাপাশি স্ট্রেস কম নিতে হবে। সঠিক সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস করতে হবে। ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে।

উপরোক্ত লাইফ স্টাইল চেঞ্জ গুলো ছাড়াও কিছু ঘরোয়া উপকরণ রয়েছে যা গ্যাস্ট্রিক দূর করতে নানাভাবে সাহায্য করে থাকে সেগুলো হলো, আদা,পুদিনাপাতা, মেথি, দারুচিনি, পেপে, ডাবের পানি, টকদই ইত্যাদি।

আদায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি প্রপার্টি রয়েছে যা গ্যাস্ট্রিক এর সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। আদা কুচি লবণ দিয়ে খাওয়া যেতে পারে অথবা আদা সিদ্ধ করে এর জল পান করতে পারেন।

আদার পাশাপাশি পুদিনাপাতা, মেথির দানা, দারুচিনি সিদ্ধ করে এর পানি পান করলে গ্যাস্ট্রিক এর সমস্যার অনেকাংশেই দূর হয়।

পেপে, ডাবের পানি, টকদই ও এই ক্ষেত্রে কার্যকর ভুমিকা পালন করে থাকে।

গ্যাস্ট্রিক এর সমস্যা আসলে মারাত্মক জীবন ঝুকিপূর্ণ কোনো সমস্যা নয়। কারণ এই সমস্যা নিরসনের অনেকগুলো কার্যকরী উপায় রয়েছে যেগুলো মেনে চললে ঔষধ সেবনের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু কেউ যদি কম থাকতেই এই রোগের চিকিৎসা না শুরু করে তা অনেক খারাপ পর্যায়ে যেতে পারে। আমাদের জীবনাচরণে সামান্য কিছু পরিবর্তন আমাদের এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে।

5/5 - (40 votes)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button