প্রেগন্যান্সি

গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা যাবে কি না?

গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। এ সময় মা ও গর্ভে বেড়ে ওঠা ছোট্ট অতিথির ভালো পুষ্টি প্রয়োজন। কিছু গর্ভবতী মহিলা ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে রোজা রাখেন। এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল গর্ভবতী মহিলার রোজা রাখা উচিত কি না এবং রোজা রাখলে কি কি বিষয় মনে রাখতে হবে। এই পোস্টটি পড়ে আপনি বুঝতে পারবেন যে, গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা গর্ভবতী মহিলাকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে এবং এর জন্য কী কী প্রস্তুতির প্রয়োজন হতে পারে। প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক গর্ভাবস্থায় রোজা রাখলে কোনো ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে কি না।

গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা কি নিরাপদ?

গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা নিরাপদ নাকি অনিরাপদ তা সম্পূর্ণরূপে গর্ভবতীর স্বাস্থ্য এবং গর্ভাবস্থার উপর নির্ভর করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, গর্ভাবস্থায় রোজা রাখলে প্রসবের সময় শিশুর স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং বয়স বৃদ্ধির সাথে তার স্বাস্থ্যের উপর।

তাছাড়া, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (স্বাভাবিক রক্তে শর্করার পরিমান) পরীক্ষা করার জন্য উপোস করতে হতে পারে। একজন সুস্থ গর্ভবতী মহিলার জন্য কিছু পরিমাণে রোজা রাখা নিরাপদ হতে পারে। তবে, গর্ভাবস্থায় রোজা রাখার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

চলুন এবার জেনে নেওয়া যাক গর্ভাবস্থায় তিন ত্রৈমাসিকে রোজা রাখা সম্পর্কে।

প্রথম ত্রৈমাসিকের সময় রোজা
প্রথম ত্রৈমাসিকের সময় রোজা রাখা নিরাপদ নয়। প্রথম ত্রৈমাসিকে রোজা রাখলে ভ্রূণের ওজন কমতে পারে, যা জন্মের সময় শিশুর ওজনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুসারে, যেসব মহিলারা গর্ভাবস্থার প্রথম ত্রৈমাসিকে রোজা রাখেননি, তাদের প্রসবের সময় তাদের সন্তানের ওজন রোজা রাখা মহিলাদের সন্তানের চেয়ে বেশি ছিল।

দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের সময় রোজা
যদিও গর্ভাবস্থায় রোজা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয় না, তবে দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের সময় ডাক্তারের পরামর্শে রোজা রাখা যেতে পারে। একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুসারে, ভ্রূণের বিকাশ এবং জন্মের সময় শিশুর ওজন এবং স্ট্রেসের প্রভাব দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে একজন ডাক্তারের পরামর্শে রোজা রাখা মহিলাদের উপর প্রভাবিত হয়নি। অন্য একটি বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন অনুসারে, গর্ভবতী মহিলারা যারা দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের সময় রোজা রাখেন তাদেরও প্রিটার্ম বা অকাল ডেলিভারির ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই মনে রাখবেন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে রোজা রাখবেন না।

তৃতীয় ত্রৈমাসিকের সময় রোজা
তৃতীয় ত্রৈমাসিকের সময় রোজা রাখা যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, তৃতীয় ত্রৈমাসিকে রোজা শিশুর বিকাশের উপর কম প্রভাব ফেলে। তবুও, রোজা রাখার আগে ডাক্তারের পরামর্শ প্রয়োজন।

গর্ভাবস্থায় রোজা রাখার জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন

গর্ভাবস্থায় রোজা রাখার আগে এই বিষয়গুলি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণঃ-

১. গর্ভাবস্থায় রোজা রাখার সময় যাতে আপনার কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা না হয় তা নিশ্চিত করতে আপনার ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।

২. ধূমপান এবং অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকুন।

৩. রোজা রাখার আগে পর্যাপ্ত পানি পান করুন, যাতে শরীরে পানির অভাব না হয়।

৪. শেষ রাতে ফল খান।

৫. মশলাদার খাবার থেকে দূরে থাকুন।

৬. পর্যাপ্ত ঘুমান।

বিঃদ্রঃ- ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া রোজা রাখা থেকে বিরত থাকুন ।

গর্ভাবস্থায় রোজা রাখার সময় কী কী বিষয় মাথায় রাখতে হবে

গর্ভাবস্থায় রোজা রাখার সময় চিকিৎসকের পরামর্শে প্রদত্ত নির্দেশনা অনুসরণ করুন-

১. যদি আপনার ধর্মে ফল এবং তাদের রস, পানি বা অন্য কোন খাবার খাওয়ার অনুমতি দেয় তবে আপনি সেগুলি খেতে পারেন।

২. দীর্ঘ দূরত্বে হাঁটবেন না।

৩. রোজা রাখার সময় যদি আপনার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কোনো সমস্যা হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন।

গর্ভাবস্থার কোন সময়ে রোজা রাখা বন্ধ করা উচিত?

নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা বন্ধ করা উচিত-

  • মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরা।
  • বমি বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যার ক্ষেত্রে।
  • পেটে শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া অনুভব করা।
  • হঠাৎ প্রস্রাবের রং পরিবর্তন বা জ্বালাপোড়া।
  • খুব ক্লান্ত লাগলে।
  • কোষ্ঠকাঠিন্যের ক্ষেত্রে।

দ্রষ্টব্য – উল্লেখিত উপসর্গ ব্যতীত অন্য কোন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিলে রোজা বন্ধ করে অবিলম্বে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন।

আরোও পড়ুনঃ ডায়রিয়া হলে করণীয় কি এবং দ্রুত সুস্থ হওয়ার উপায়, গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসা ও ঘরোয়া প্রতিকার

গর্ভাবস্থায় রোজা রাখার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

গর্ভাবস্থায় রোজা রাখার কিছু অসুবিধা হতে পারে। যেমন-

  • জন্মগতভাবে শিশুর ওজন কম হতে পারে।
  • মায়ের ডায়রিয়া, বমি এবং মাথা ঘোরা হতে পারে।
  • ডায়াবেটিসের সম্মুখীন হতে পারেন।
  • সিজারিয়ান ডেলিভারির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
  • ভ্রূণের শ্বাস-প্রশ্বাসের হার কমে যেতে পারে।
  • লেবার পেইন বাড়তে পারে।
  • নবজাতককে আইসিইউতে (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) ভর্তি করতে হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় রোজা ভাঙার সঠিক উপায় কি?

এখানে আমরা এমন কিছু রোজা ভাঙার পদ্ধতির কথা বলব, যা গর্ভবতী মহিলাদের জন্য উপকারী। তারপরও এ বিষয়ে একবার চিকিৎসক ও ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া ভালো হবে।

  • প্রথমে শুধুমাত্র হালকা পানীয় পান করুন। তাড়াহুড়ো করে বেশি পরিমাণে খাওয়া বা পান করার কথা ভাববেন না।
  • ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খান এবং পরিমিতভাবে খান।
  • চিনি, চা ও ঠান্ডা পানীয় ইত্যাদির মাধ্যমে রোজা ভঙ্গ করা থেকে বিরত থাকুন।

রোজা রাখার পরিবর্তে এই বিকল্প পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করুন

রোজা না রেখে, আপনি এই পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করতে পারেন, যা স্বাস্থ্যের জন্য ভাল।

১. প্রতিদিন রোজা রাখার পরিবর্তে সপ্তাহের যে কোনো একদিন রোজা রাখা যেতে পারে।

২. ধর্মীয় উপবাস বা রোজা রাখার জায়গায় দান-খয়রাত ইত্যাদি করা যায়।

৩. চিকিৎসকের পরামর্শে প্রথম ও শেষ দিনে রোজা রাখা যেতে পারে।

৪. সম্ভব হলে গরীবদের খাবার ইত্যাদি দিতে পারেন।

এটি প্রায় প্রতিটি ধর্মের বিশ্বাস যে, আপনি যদি সুস্থ থাকেন এবং রোজা রাখার মতো অবস্থায় থাকেন তবেই কেবল রোজা রাখুন। কারণ, প্রায় সব ধর্মীয় নিয়মে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য রোজা রাখার নিয়ম সম্পর্কে কঠোর নয়।

আরো পড়ুনঃ

সচরাচর জিজ্ঞাস্য

রমজান মাসে গর্ভবতী মহিলাদের রোজা রাখা উচিত কিনা?

এটি সম্পূর্ণরূপে আপনার স্বাস্থ্য এবং ডাক্তারের পরামর্শ এর উপর নির্ভর করে। যদি ডাক্তার আপনার স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে রমজানে রোজা না রাখার পরামর্শ দেন, তাহলে গর্ভবতী মহিলার রোজা রাখা থেকে বিরত থাকতে হবে। হ্যাঁ, গর্ভাবস্থা শেষ হওয়ার পর রোজা রাখতে পারেন।

নবরাত্রির সময় গর্ভবতী মহিলাদের উপবাস করা উচিত?

নবরাত্রির সময় গর্ভবতী মহিলাদের চিকিৎসকের পরামর্শে উপবাস রাখা ভালো হবে। সম্ভব হলে নয় দিন উপবাস না করে শুধুমাত্র প্রথম বা শেষ নবরাত্রিতে উপবাস রাখুন।

আমি রোজা রাখব কি করব না তা নিয়ে দ্বিধায় আছি। আমার কি করা উচিৎ?

একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, আপনার স্বাস্থ্য যদি ভালো থাকে এবং শরীরে কোনো পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি না থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শে রোজা রাখাই সঠিক। এটি ভ্রূণের স্বাস্থ্য, তার বিকাশ এবং জন্মের পরে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের উপর কোনও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে গর্ভবতী মহিলাকে বমি, ডায়রিয়া এবং শিশুর কম ওজনের সমস্যায় পড়তে হতে পারে। এছাড়াও, ডায়াবেটিস এবং সিজারিয়ান ডেলিভারির মতো অবস্থা গর্ভাবস্থায় দেখা দিতে পারে।

আশা করি আপনি এই পোস্টে দেওয়া তথ্য থেকে উপকৃত হবেন। তাছাড়াও, এই সময়ে আপনার স্বাস্থ্যের সম্পূর্ণ যত্ন নিন এবং কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে আপনার পরিবারের সদস্যকে জানান। একই সঙ্গে রোজা রাখার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আরো পড়ুনঃ গর্ভাবস্থায় জ্বরের কারণ ও কমানোর ঘরোয়া উপায়, গর্ভাবস্থায় শ্বাসকষ্ট (শ্বাসকষ্ট) কারণ ও মুক্তির উপায়, গর্ভাবস্থায় বমি এবং বমি বমি ভাব (সকালের অসুস্থতা)

4.2/5 - (9 Reviews)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button