স্বাস্থ্য

তেজপাতার উপকারিতা ও ব্যবহার

তেজপাতার অসংখ্য গুণ রয়েছে তাই এটি আয়ুর্বেদে ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। যদিও খাবারের স্বাদ ও গন্ধ বাড়াতে তেজপাতাকে শুকনো মশলা হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে এছাড়াও এটি মাথাব্যথা, ঠান্ডা, হাঁপানি, অ্যানোরেক্সিয়ার মতো অনেক রোগ থেকে মুক্তি দিতে সাহায্য করে।

তেজপাতা কি?

তেজপাতার বোটানিক্যাল নাম Cinnamomum albiflorum এবং এটি Lauraceae. পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।

আমরা খাবারে যে তেজপাতা ব্যবহার করি তা শুকিয়ে যায়। শুকনো পাতা তেজপাতার নামে বাজারে বিক্রি হয়। এর পাতার রং জলপাই সবুজ এবং উপরের অংশ মসৃণ এবং ৩টি স্বতন্ত্র শিরা রয়েছে। এর গন্ধ খুবই মৃদু এবং মনোরম।

এটি ৭.৫ মিটার উচ্চতার ছোট থেকে মাঝারি আকারের একটি চিরহরিৎ গাছ।

এর কান্ডের বাকলের রঙ গাঢ় বাদামী, সামান্য রুক্ষ, দারুচিনির চেয়ে কম সুগন্ধি ও স্বাদহীন, বাইরের অংশ হালকা গোলাপী বা সাদা ডোরাকাটা লালচে বাদামী।

এর পাতা সরল, ১০-১২ সেমি লম্বা, বিভিন্ন প্রস্থের, উপবৃত্তাকার, চকচকে, সূক্ষ্ম, ৩ টি শিরাযুক্ত সুগন্ধযুক্ত এবং স্বাদে তীক্ষ্ণ। এর নতুন পাতা গোলাপি বর্ণের।

এর ফুল হালকা হলুদ বর্ণের। এর ফল উপবৃত্তাকার, মাংসল, লাল রঙের, ১৩ মিমি লম্বা। এর ফুল ও ফলের সময়কাল আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

তেজপাতার দরকারী অংশ
তেজপাতার মূল এবং কান্ডের ছাল, পাতা এবং তেল সাধারণত ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

তেজপাতা কিভাবে ব্যবহার করবেন?
আপনি যদি কোনো নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসার জন্য তেজপাতা ব্যবহার করেন, তাহলে অবশ্যই একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তেজপাতার গুঁড়া ১০-১৫ গ্রাম ব্যবহার করা যায়।

তেজপাতা কোথায় পাওয়া যায় এবং জন্মায়?
বন্য তেজপাতা গাছ গ্রীষ্মমন্ডলীয় এবং অতিরিক্ত উপ-গ্রীষ্মমন্ডলীয় হিমালয় থেকে ভুটান পর্যন্ত ৯০০-১৫০০ মিটার উচ্চতায়, সিকিমে ২৪০০ মিটার পর্যন্ত এবং সিলেট ও ​​খাসিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে ৯০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পাওয়া যায়।

তেজপাতার উপকারিতা ও ব্যবহার

তেজপাতার অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি, অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্যের কারণে আয়ুর্বেদ চিকিৎসার জন্য এর একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। তেজপাতা হালকা, তিক্ত, তেতো, মিষ্টি, গরম প্রকৃতির। এটি হজমে সাহায্য করে, মস্তিষ্ককে ত্বরান্বিত করে, প্রস্রাব বিশুদ্ধ করে, পাকস্থলী বা পাকস্থলীর জন্য স্বাস্থ্যকর। এর পাতার নির্যাস ডায়রিয়া কমাতে উপকারী। এর পাতার গুড়া হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় উপকারী।

আসুন জেনে নিই তেজপাতার ঔষধিগুণ সম্পর্কে, কীভাবে এবং কোন রোগের চিকিৎসা হিসেবে এটি ব্যবহার করা হয়।

মাথাব্যথার জন্য

মাথাব্যথার সমস্যা আজকাল মানুষের সাধারণ হয়ে উঠেছে। সারাদিন কাজের চাপ, দৌড়াদৌড়ি, কম্পিউটারে একটানা কাজ, ফোনের স্ক্রিনে একটানা কাজ করা, রোদে হাঁটা, অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ইত্যাদির কারণে অসংখ্য মাথাব্যথা হয়ে থাকে। এর জন্য তেজপাতার ঘরোয়া উপায় খুবই উপকারী। 10 গ্রাম তেজপাতা পানিতে পিষে মাথার ত্বকে লাগালে ঠান্ডা বা গরমজনিত মাথাব্যথা থেকে উপশম হয়।

মাথার উকুন থেকে মুক্তি পেতে
মাথায় উকুনের সমস্যা শুরু হোক বা না হোক শিশুরা স্কুলে যাওয়া শুরু করে। এই তেজপাতার প্রতিকার চুলের ক্ষতি না করেই উকুন দূর করতে খুব কার্যকরভাবে কাজ করে। এক গ্লাস পানিতে তেজপাতার ৫-৬টি পাতা সিদ্ধ করুন যাতে পানি অর্ধেক থাকে। এই পানি দিয়ে প্রতিদিন মাথা ম্যাসাজ করে গোসল করুন। এতে মাথায় উকুন হয় না।

আরো পড়ুনঃ উকুন দূর করার উপায় যা চুলকে সুস্থ রাখবে

সর্দি-কাশির জন্য
আবহাওয়ার পরিবর্তন হোক বা না হোক, শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই ঠাণ্ডা-সর্দির সমস্যায় লড়তে থাকে। চা পাতার পরিবর্তে তেজপাতার গুঁড়ো দিয়ে তৈরি চা পান করলে ঠাণ্ডা-সর্দি, হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, জ্বালাপোড়া, মাথাব্যথা ইত্যাদি রোগে দ্রুত উপকার পাওয়া যায়। এছাড়া ৫ গ্রাম তেজপাতার ছাল ও ৫ গ্রাম ছোট পিপলি একসঙ্গে পিষে ৫০০ মিলিগ্রাম গুঁড়া মধুর সঙ্গে চাটলে সর্দি-কাশিতে উপকার পাওয়া যায়।

চোখের রোগে উপকারী
চোখের রোগে অনেক কিছু আসে, যেমন সাধারণ চোখে ব্যথা, রাতকানা, লাল চোখ ইত্যাদি। এই সব ধরনের সমস্যায় তেজপাতার তৈরি একটি ঘরোয়া উপায় খুবই উপকারী। তেজপাতা পিষে চোখে লাগালে চোখের রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

দাঁত সাদা করার ক্ষেত্রে-
যদি কোনো কারণে দাঁতের তেজ কমে যায়, তাহলে তেজপাতার সূক্ষ্ম গুঁড়া (হিন্দিতে তেজপাত্তা উপকারী) সকাল-সন্ধ্যা দাঁতে ঘষলে দাঁতে উজ্জ্বলতা আসে।

মাড়ির রোগের চিকিৎসায়-

মাড়ি ফুলে যাওয়া, রক্তপাতের মতো সমস্যা থাকলে তেজপাতার ওষুধি গুণাগুণ চিকিৎসা হিসেবে খুবই উপকারী। তেজপাতার ডাঁটা চিবিয়ে খেলে মাড়ি থেকে রক্ত ​​পড়া বন্ধ হয়।

তোতলাতে উপকারি
যদি কারো মাঝে মাঝে কথা বলা বা নাড়াচাড়া করার সমস্যা থাকে, তবে তেজপাতার ঘরোয়া প্রতিকার উপকারী প্রমাণিত হতে পারে। নিয়মিত তেজপাতা চুষে খেলে নাড়তে আরাম পাওয়া যায়।

হাঁপানির রোগে-
যতবারই আবহাওয়ার পরিবর্তন হয় বা ঠান্ডা আবহাওয়া আসে ততবারই হাঁপানি রোগীর সমস্যা বাড়ে।

আদার মোরব্বা শরবতে তেজপাতা ও পিপল 2 গ্রাম করে ছিটিয়ে চাটলে হাঁপানিতে উপশম হয়। এ ছাড়া এক চামচ শুকনো তেজপাতার গুঁড়া এক কাপ গরম দুধের সঙ্গে নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যা খেলে শ্বাসকষ্টে উপশম হয়।

অ্যানোরেক্সিয়ায়-
কোনো রোগের কারণে বা মানসিক চাপের কারণে খাওয়ার ইচ্ছা কমে গেলে এইভাবে তেজপাতা খেলে দ্রুত উপশম হয়। সকাল-সন্ধ্যা তেজপাতার রায়তা পান করলে ক্ষুধামন্দার সমস্যা দূর হয়।

বমি থেকে মুক্তি দেয়-
কোনো কারণে বারবার বমি অনুভূত হলে এর গুঁড়া ২-৪ গ্রাম খেলে বমিভাব দূর হয়। এ ছাড়া এলাচ, লবঙ্গ, দারুচিনি ও তেজপাতার গুঁড়া (১-৪ গ্রাম) মধু মিশিয়ে খেলে আলসার বা বমি বা বিল্ব, হরদ, বহেরা, আমলা ও পিপ্পলি, মারিচ, শুকনো আদা (১-৪ গ্রাম) এর গুঁড়া উপশম হয়। ৪ গ্রাম) মধুর সাথে খেলেও বমির শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়।

ডায়রিয়া বন্ধ করতে-
বেশি মশলাদার খাবার, প্যাকেটজাত খাবার বা বাইরের খাবার খাওয়ার কারণে যদি ডায়রিয়া হয় যা থামার নামই নিচ্ছে না তাহলে তেজপাতার ঘরোয়া প্রতিকার খুবই উপকারী হবে। পাতার গুঁড়া ১-৩ গ্রাম চিনি ও মধুর সঙ্গে মিশিয়ে খেলে ডায়রিয়া ও পেটব্যথা দূর হয়।

লিভারের প্রদাহের চিকিৎসায়-
কোনো রোগের কারণে লিভার ফুলে গেলে এইভাবে তেজপাতা খেলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়। তেজপাতা, রসুন, কালো গোলমরিচ, লবঙ্গ ও হলুদের গুঁড়া সমপরিমাণ করে এক ক্বাথ তৈরি করে ১০-২০ মিলি সেবন করলে লিভার সংক্রান্ত রোগে উপকার পাওয়া যায়।

ডেলিভারি সহজ করতে-
প্রসবের সময় প্রতিটি গর্ভবতী মহিলার জন্য খুব বেদনাদায়ক। এইভাবে তেজপাতা ব্যবহার করা ডেলিভারি প্রক্রিয়া সহজ করতে সাহায্য করে। এর পাতায় ধোঁয়া (যোনিতে) দিলে সন্তান সুখে জন্মায়।

জরায়ু বিশুদ্ধকরণে-
তেজপাতার গুঁড়ো ১-৩ গ্রাম সকাল-সন্ধ্যা সেবনে জরায়ু সেরে যায়। তেজপাতার ক্বাথ বসে খেলে জরায়ুর ব্যথা কমে। তেজপাতার ক্বাথ 40-60 মিলিলিটার গ্রহণ করে, অর্থাৎ সকাল-সন্ধ্যায় যার প্রসব হয়েছে, তার জরায়ু দূষিত রক্ত ​​ও মল ইত্যাদি অপসারণ করে পবিত্র হয়।

আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায়-

আজকাল বয়সের কারণে বাতের সমস্যা হয় না। সারাদিন এসি-তে থাকার কারণে বা বসে থেকে বেশি কাজ করার কারণে যে কোনো বয়সেই মানুষ এই রোগের শিকার হতে শুরু করেছে। এ থেকে মুক্তি পেতে তেজপাতা ব্যবহার করতে পারেন এভাবে। তেজপাতা পিষে অস্থিসন্ধিতে লাগালে বাত রোগে উপকার পাওয়া যায়।

রক্তপাতের ক্ষেত্রে-
শরীরের কোনো অংশ থেকে রক্তক্ষরণ বা রক্তপাত হলে এক চামচ তেজপাতার গুঁড়ো এক কাপ পানির সঙ্গে ২-৩ বার খেলে উপকার পাওয়া যায়।

শরীরের দুর্গন্ধ থেকে মুক্তি পেতে-
গ্রীষ্মের মৌসুমে ঘামের কারণে শরীরে দুর্গন্ধ শুরু হয় এবং এর কারণে অনেককে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। এ জন্য সমপরিমাণ তেজপাতা, সুন্ধবলা, আগরু, হরিতকি ও চন্দন কাঠের পেস্ট শরীরে লাগালে ঘাম থেকে উদ্ভূত দুর্গন্ধ কমে যায় ।

পাচনতন্ত্রের জন্য উপকারী-
তেজপাতার গরম বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি হজমের আগুনকে তীব্র করে ক্ষুধা বাড়ায়, সেই সাথে হজম শক্তিকে শক্তিশালী করে।

ক্যান্সারের চিকিৎসায় উপকারী-
একটি গবেষণা অনুসারে, তেজপাতার মধ্যে ক্যান্সার-বিরোধী গুণও পাওয়া যায়, যার কারণে ক্যান্সারের লক্ষণগুলিও কমানো যায়।

ওজন কমাতে-
ওজন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হল কফ দোশা বৃদ্ধি। তেজপাতার উপশমকারী বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি ওজন কমাতেও সহায়ক।

হার্টকে সুস্থ রাখতে-
একটি গবেষণা অনুসারে, তেজপাতার মধ্যে হার্টকে সুস্থ রাখার গুণাবলী পাওয়া যায়। তেজপাতা সেবন কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে যার ফলে হার্ট সংক্রান্ত কিছু সমস্যার উপসর্গ কমে যেতে পারে।

পিরিয়ডের সময়-
মাসিকের সময় ব্যথার প্রধান কারণ হল বাত দোষের বৃদ্ধি। এমন পরিস্থিতিতে তেজপাতার নিরাময়কারী গুণের কারণে এই অবস্থায় উপকার পাওয়া যায়।

স্ট্রেসের চিকিৎসায়-
ভাটা দোষ চাপের কারণে ভারসাম্যহীন হয়। এমন পরিস্থিতিতে, তেজপাতার পরে ভ্যাটা নিরাময়কারী বৈশিষ্ট্য রয়েছে, এটি চাপ এবং কাজ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

আরো পড়ুনঃ ডিপ্রেশন কি, এর কারণ, লক্ষণ এবং ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির উপায়, মানসিক চাপ কমানোর উপায় এবং চাপমুক্ত থাকার জন্য করণীয়

আলসারের চিকিৎসায় উপকারী-
আলসারের কারণ হল দুর্বল হজম। তেজপাতার মধ্যে দীপন- হজমের কারণে এটি হজম সারিয়ে তোলে, যা আলসার হওয়ার সম্ভাবনা কমায়।

কোলেস্টেরল নিরাময়ে-
আপনি যদি কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বিরক্ত হন, তাহলে আপনার খাদ্যতালিকায় তেজপাতা যোগ করা উচিত কারণ একটি গবেষণা অনুসারে, তেজপাতার ব্যবহারও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে উপকারী।

আরো পড়ুনঃ

5/5 - (14 Reviews)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button